শিরোনামঃ

ঘর নেই, খাবার নেই, স্বজনও নেই—জরাজীর্ণ যাত্রীছাউনিতে ৭৫ বছরের অসুস্থ জহুরা

মোঃ হাচান আল মামুন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ঘর নেই, খাবার নেই, স্বামী-সন্তান কেউ নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ৭৫ বছর বয়সী অসুস্থ জহুরা বেগমের ঠিকানা এখন একটি জরাজীর্ণ যাত্রীছাউনি। মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাদ, নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা নেই, নেই দেখভালের মতো আপনজনও। অসুস্থ শরীর নিয়ে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়েই সেখানে দিন-রাত কাটছে তাঁর।
হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার ১ নং মেরুং ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বেতছড়ি এলাকায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ৩০ বছর আগে স্বামীকে হারান জহুরা বেগম। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। দীর্ঘদিন অসুস্থতায় ভুগে প্রায় ১৫ বছর আগে তাঁরাও মারা যান। এরপর থেকেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন জহুরা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থতাও বেড়েছে। জীবনের শেষ সময়ে এসে আপন বলতে তাঁর আর কেউ নেই।
সম্পর্কের জেঠি হওয়ায় প্রায় দুই বছর আগে বেতছড়ি এলাকার আলম মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন জহুরা। কিন্তু আলম মিয়াও বর্তমানে এলাকায় নেই। আরেকজন স্বজন এলাকায় থাকলেও তিনিও অসুস্থ। ফলে জহুরার দেখভাল করার মতো কার্যত কেউ নেই।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে সম্প্রতি খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। চিকিৎসা শেষে ফিরে বেতছড়ি এলাকার এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে প্রায় দুই মাস থাকার পর সেই আশ্রয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিতে হয়েছে এলাকার একটি পুরোনো যাত্রীছাউনিতে।
বর্তমানে সেই জরাজীর্ণ যাত্রীছাউনিই জহুরা বেগমের ঘর, ঠিকানা ও আশ্রয়স্থল। ছাউনিটির অবস্থা এতটাই নাজুক যে সামান্য বৃষ্টি হলেই ভেতরে পানি পড়ে। নিরাপদে থাকার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। অসুস্থ শরীর নিয়ে বৃষ্টি ও দুর্যোগের মধ্যেই সেখানে পড়ে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও অন্যের ভিটায় একটি জরাজীর্ণ ঘরে থাকতেন জহুরা। নিজের কোনো জায়গা-জমি নেই। বয়স ও অসুস্থতার কারণে সেই আশ্রয়টুকুও হারিয়েছেন। এখন দিনের পর দিন একটি যাত্রীছাউনিতে পড়ে থাকাই তাঁর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যাত্রীছাউনিতে জহুরার পাশে পড়ে রয়েছে একটি অটোরিকশা (দুলনা)। অথচ ওই বৃদ্ধার নিজের থাকার জন্য নেই একটি নিরাপদ ঘর। নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা, নেই চিকিৎসার স্থায়ী ব্যবস্থা। কখনো কেউ খাবার দিলে খান, না হলে অনাহারেই কাটে দিন—এমনটাই জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জহুরা বেগমের করুণ অবস্থার কথা ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন—জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন অসুস্থ বৃদ্ধার ঠিকানা কি একটি ভাঙাচোরা যাত্রীছাউনি হতে পারে?
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, জহুরা বেগমের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকলেও স্থায়ীভাবে তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ এগিয়ে আসেনি।
তাঁর পাশে দাঁড়াতে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বিত্তবান ও হৃদয়বান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন এবং মানবিক মানুষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের উদ্যোগে জহুরা বেগমকে দ্রুত একটি নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া, নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। জীবনের শেষ দিনগুলো যেন অন্তত নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে কাটাতে পারেন—এটাই এখন অসহায় এই বৃদ্ধার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
একটি নিরাপদ ঘর, দুবেলা খাবার আর একটু মানবিক আশ্রয়—জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জহুরা বেগমের চাওয়া যেন এতটুকুই। এখন প্রয়োজন, তাঁর এই আকুতি সংশ্লিষ্টদের কানে পৌঁছানো।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL