পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা সদর থেকে মেরুং পেরিয়ে লংগদু যাবার বিশ কিলোমিটারের পথে ভূঁইয়াছড়ি গ্রাম। মূল সড়ক থেকে পায়েহাঁটা পথে পূর্বপাশ ধরে উঁচু-নিচু টিলা-পাহাড় ঘেরা এই গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক কৃষির সাথে যুক্ত মো. সালাউদ্দিন (৪০)। তাঁর সেই বাড়িতে যেতেই চোখে পড়বে অসংখ্য ফলবতী আমের গাছ। কিন্তু হঠাৎ করেই চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠলো থোকায় থোকায় সবুজাভ লতানো কিছু ফলের বাহার দেখে। প্রথমে অচেনা মনে হলেও পরে জানা গেলো, এটি ‘বাইকুনুর’ জাতীয় আঙ্গুরের বাগান।
ইউটিউব ও ফেসবুক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০২৩ সালে অনলাইনে ইউক্রেনের ‘বাইকুনুর’ জাতের মাত্র দুটি চারা ১৪০০ টাকা দিয়ে কিনে শুরু করা তার এই বাগানে এখন ষাটের অধিক বিভিন্ন জাতের আঙ্গুর ফলের চারা রয়েছে। তবে সালাউদ্দিন আম বাগানে কৃষি বিভাগের কিছুটা সহযোগিতা পেলেও আঙ্গুর আবাদে কোনই সাড়া পাচ্ছেন না।
সালাউদ্দিন জানান, জীবনের নানা বাস্তবতায় শিক্ষাজীবনে মাধ্যমিক থেকে ছিটকে পড়লেও দমে যাবার মানুষ তিনি নন। সবাই যা করেন বা করতে চান; তিনি ঠিক তার উল্টো না হলেও চেষ্টা করেন নতুন কিছু একটা করতে। পৈতৃক টিলাভূমিকে সম্বল মেনে নিজের শ্রমকে পূঁজি করে শুরু করেন নানা জাতের আমের বাগান। সেই সফলতার হাত ধরে তিনি দেখলেন, চারপাশে সবাই শুধু আমের বাগানই করছেন। একসময় বাগান আর ফলন বেড়ে যাওয়ায় কখনো কখনো ফলের দামও পড়তির দিকে ধাবমান। তাই তিনি নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন একটি ব্যতিক্রমধর্মী বিদেশী জাতের আঙ্গুর বাগান।
সরেজমিনে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ১৫ শতক জমিতে গড়ে উঠেছে সালাউদ্দিনের বাগান। খাগড়াছড়িতে বিদেশি জাতের মিষ্টি আঙ্গুর চাষে তিনিই অন্যতম পথিকৃৎ এবং দীঘিনালায় একমাত্র আঙ্গুর চাষি। তার বাগান দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন এবং অনেকেই চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, দেড় দশক আগে দীঘিনালার বিখ্যাত ফলচাষী তুষার দাশ নিজের বাগানে পরীক্ষামূলকভাবে আঙ্গুর চাষ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ফলে মিষ্টতার পরিবর্তে অতিরিক্ত টকের কারণে তিনি আর বেশিদূর এগোতে পারেননি। এখন পুরো খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাতেই সালাউদ্দিন ছাড়া আর কেউ আঙ্গুর চাষ করছেন কী না; জানেন না খোদ কৃষি বিভাগও।
সালাউদ্দিনের তথ্যমতে, তার বাগানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৬০ ধরনের আঙ্গুরের জাত রয়েছে। ফেসবুক মেসেঞ্জার ও অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে রাশিয়া, ইউক্রেন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের চারা সংগ্রহ করেছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাইকুনুর’, ‘দোভস্কি পিং’, ‘ভাইকিংস টু’, ‘গ্লুরি’, ‘ডিক্সন’, ‘দাসোনিয়া’, ‘নিউরো ব্ল্যাক’, চীনের ‘চ্যাং ফিঙ্গার’ এবং মালয়েশিয়ার ‘গ্রীন লং’। এছাড়া ‘সিসিলি’, ‘রেড গ্লোব’, ‘আইসবার্গ’, ‘আর্লি রেড’, ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’, ‘এলব্রোস’ ও ‘রেড রোজ’সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জাতের আঙ্গুরও রয়েছে তার বাগানে।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরে তার বাগান থেকে প্রায় ৬০০ কেজি আঙ্গুর উৎপাদন হবে। শুধু ফল উৎপাদন নয়, গ্রাফটিং ও রুট পদ্ধতিতে উৎপাদিত আঙ্গুরের চারা অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে তিনি উল্লেখযোগ্য আয় করছেন। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মৌসুমে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার চারা বিক্রি করেন, যার প্রতিটির দাম ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।
বাগান তৈরিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, সঠিক পদ্ধতি জানা থাকলে জৈব সার ব্যবহার করে সহজেই আঙ্গুর চাষ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে আঙ্গুর চাষকে আরও বিস্তৃত করে দেশের সম্ভাবনাময় কৃষিখাতে পরিণত করার লক্ষ্য তার।
তবে পাহাড়ের চূড়ায় বাগান হওয়ায় মাঝে মধ্যে পানির সংকটে পড়তে হয় বলেও জানান তিনি। সরকারের কাছে থেকে সহযোগিতা পেলে তার এই আঙ্গুর ফলের বাগানকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক আকারে সম্প্রসারিত করার আশা প্রকাশ করেছেন মো. সালাউদ্দিন।
উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা শামীম আবরার সালাউদ্দিনের আঙ্গুর বাগানটি বেশ কয়েকবার পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, মানুষের শ্রম আর একাগ্রতায় অনেক কিছুই সম্ভব। কিন্তু কৃষি উদ্যোক্তা মো. সালাউদ্দিন পাহাড়ে আঙ্গুর ফলিয়ে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমাদের বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, দীঘিনালায় সাহসিকতার সঙ্গে একমাত্র উদ্যোক্তা হিসেবে আঙ্গুর বাগানটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পাহাড়ের মাটিতে অধিক মূল্যবান ফল হিসেবে আঙ্গুর চাষ সম্প্রসারণ সম্ভব হলে প্রান্তিক কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী জানান, আঙ্গুর মূলত: মাইক্রো ক্লাইমেট এরিয়ার ফল। উপ-মহাদেশের শীতপ্রধান কাশ্মীর অঞ্চলে আঙ্গুরের উৎপাদন আশাব্যঞ্জক। আমাদের দেশে কোথাও সফলতা এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের নজির নেই। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পাহাড়ে কোথাও কোথাও কোন কোন সৌখিন কৃষি উদ্যোক্তা চেষ্টা করেছিলেন। তবে দীঘিনালার মো. সালাউদ্দিন অনেকদূর এগিয়েছেন। আমরা তাঁর বাগানটিকে নজরে রেখেছি। সফলতা পেলে এটি হবে পাহাড়ের কৃষির জন্য নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার।