শিরোনামঃ

চট্টগ্রাম বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার ‘গোপন ছক’

কাঞ্চন চক্রবর্ত্তী
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: কাঞ্চন চক্রবর্তী
ছবি: কাঞ্চন চক্রবর্তী

দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন ও সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ‘কেপিআই-১স্থাপনা চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বিতর্কিত বিদেশি প্রতিষ্ঠান 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-এর হাতে তুলে দেওয়ার এক নতুন ও গোপন মহাপরিকল্পনা উন্মোচিত হয়েছে। শুধু নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নয়, এবার সিসিটি, জিসিটি এবং ওভারফ্লো ইয়ার্ডসহ বন্দরের প্রায় সমস্ত অপারেশনাল অংশ বিদেশি করপোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে বলে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে।
​আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) চট্টগ্রাম এই অভিযোগ তোলে। শ্রমিক নেতারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই আত্মঘাতী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হলে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে। প্রয়োজনে জানুয়ারি মাসের মতোই বন্দর অচল করে দেওয়ার মতো তীব্র 'শাটডাউন' আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
​সংবাদ সম্মেলনে স্কপের যৌথ সমন্বয়ক ইফতেখার কামাল খান লিখিত বক্তব্যে জানান, গত জানুয়ারির শেষে তীব্র শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মঘট এবং দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতিরোধের মুখে কর্তৃপক্ষ ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি ৬ মাসের জন্য স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পর্দার আড়ালে তৎপরতা এখনও জারি রয়েছে।
​লিখিত বক্তব্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলা হয়:
​গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিডার (BIDA) চেয়ারম্যান ও নৌ মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ডিপি ওয়ার্ল্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন।নতুন প্রস্তাবনায় শুধু এনসিটি নয়, সিসিটি, জিসিটি এবং ওভারফ্লো ইয়ার্ডসহ বন্দরের প্রায় সিংহভাগ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার নীলনকশা করা হয়েছে।"বিদেশি কোম্পানি ছাড়া বন্দর চালানো সম্ভব নয়"—কর্তৃপক্ষের এমন দাবিকে সম্পূর্ণ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অসত্য’ বলে আখ্যা দিয়েছে স্কপ। কারণ সিসিটি ও এনসিটি উভয় টার্মিনালই বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের দক্ষতায় অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।​শ্রমিক নেতারা মনে করিয়ে দেন, যে বন্দর দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়, তার নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রাইভেট কোম্পানির হাতে দেওয়া মানে দেশের অর্থনৈতিক চাবিকাঠি অন্য রাষ্ট্রের হাতে সঁপে দেওয়া।
​"চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এই একই ভৌগোলিক জোনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান কার্যালয়, বিপিসির (BPC) জ্বালানি স্থাপনা এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবস্থিত। ফলে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ শুধু ব্যবসা বা মুনাফার বিষয় নয়, এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।"
​সংবাদ সম্মেলনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, বন্দর রক্ষার যৌক্তিক আন্দোলন দমাতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে শ্রমিকদের ওপর মামলা, গ্রেপ্তার এবং শাস্তিমূলক বদলির মতো চরম দমনমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। এর আগে জানুয়ারির আন্দোলনের সময়ও ১৬ জন প্রধান সমন্বয়কারী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য জেলায় শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। বর্তমানে বহু নেতাকর্মী জামিনে থাকলেও এক চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
​জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেকোনো চুক্তি রুখে দিতে দেশের সর্বস্তরের জনগণ, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে স্কপ। এই স্পর্শকাতর ও জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের সরাসরি বক্তব্য শুনতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি সাক্ষাতের আবেদন জানিয়েছেন তারা।
​সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক নেতা তপন দত্ত, শেখ নুরুল্লাহ বাহার, এস কে খোদা তোতন, কাজী আনোয়ারুল হক হুনি, খোরশেদুল ইসলাম, রবিউল হক শিমুল, হেলাল উদ্দিন কবির, ডক শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন এবং সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিমসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণ এভাবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার তোড়জোড় যদি বন্ধ না হয়, তবে বিগত জানুয়ারির মতোই পণ্য খালাস ও লোডিং কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক স্থবিরতার মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকার শ্রমিকদের এই যৌক্তিক দাবিকে কতটা গুরুত্ব দেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL