দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে সরকারি কোষাগার এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত রাজস্ব আয় প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা, আর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব পরিচালন আয় ছাড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা।
এই সাফল্যের পেছনে বন্দর পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং তাঁর সঙ্গে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করা কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহসহ বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বন্দরের কার্যক্রমে গতি, অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি, জাহাজ ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন এবং সেবার মানোন্নয়নের ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে এই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি
বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ফলে এই বন্দরের সক্ষমতা ও কার্যকারিতা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদায়ী অর্থবছরে বন্দর দিয়ে মোট প্রায় ১১ কোটি ২৪ লাখ টন আমদানি ও রপ্তানি পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। এসব পণ্যের শুল্কায়িত মূল্য দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ কোটি টাকারও বেশি, যা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তৃতির প্রতিফলন।
সরকারি কোষাগারে ৮৬ হাজার কোটি টাকা
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১০ কোটি ৭৫ লাখ টন আমদানি পণ্য খালাস হয়েছে। এসব পণ্যের শুল্কায়িত মূল্য ছিল প্রায় ৫ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। এই পণ্য থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস, কমলাপুর আইসিডি, পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল এবং চট্টগ্রাম ইপিজেড কাস্টমস স্টেশনের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
আগের অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭৮ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানিয়েছেন, এককভাবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসেই রাজস্ব আদায়ে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশের পর এ পরিমাণ আরও কিছুটা বাড়তে পারে।
শুধু সরকারি রাজস্ব নয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব আয়ও ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বিদায়ী অর্থবছরে কনটেইনার ও বাল্ক কার্গো পরিচালনা থেকে বন্দরের আয় হয়েছে ৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের ৩ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা থেকে প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি।
বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি এবং ট্যারিফ সমন্বয়ের ফলে পরিচালন রাজস্বে এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে।
নেতৃত্বে আলোচনায় মনিরুজ্জামান ও আবদুল্লাহ
বন্দরসংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান দায়িত্ব গ্রহণের পর অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত জাহাজ খালাস, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেবার গতি বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এসব পদক্ষেপের সুফল বিদায়ী অর্থবছরের রাজস্ব আয়ের পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
একই সঙ্গে কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহও বন্দরের প্রশাসনিক ও পরিচালন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন। তাঁদের নেতৃত্বে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বন্দর ঘিরে হাজারো কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড
চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে শুধু সরকারি রাজস্বই নয়, গড়ে উঠেছে বিশাল বেসরকারি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বন্দরের বাইরে থাকা ২০টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো, টার্মিনাল অপারেটর, জেটি অপারেটর, শিপিং লাইন, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান অপারেটরসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সরকারি রাজস্বের বাইরে প্রতিবছর চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, যা দেশের কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
নতুন প্রত্যাশা
বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের এই ধারাবাহিক অগ্রগতি ধরে রাখতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বে টার্মিনালসহ চলমান উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সেবার মান আরও উন্নত করা প্রয়োজন। এতে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে এবং ভবিষ্যতে রাজস্ব আয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি রাজস্বের বাইরে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম এই বন্দরকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।
রাজস্ব আয়, পণ্য পরিবহন ও অপারেশনাল সক্ষমতার এই ধারাবাহিক অগ্রগতি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরও শক্তিশালী করেছে। বন্দরসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান ও কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহর নেতৃত্বে চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দর আরও বড় অর্থনৈতিক মাইলফলক স্পর্শ করবে।