স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শিক্ষা অবকাঠামোর বেহাল চিত্র এখনো স্পষ্ট। রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জাতীয়করন এলিম সাংদালা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তারই একটি বাস্তব উদাহরণ। নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক হলেও বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবন,ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়নবঞ্চনা স্থানীয়দের মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি করেছে।
সোমবার (১৬ জুন) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,বিদ্যালয়ে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও সন্তোষজনক। তবে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর একমাত্র সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে কাদা,পাহাড়ি ঢল ও ভাঙাচোরা কালভার্টের কারণে শিক্ষার্থী,শিক্ষক ও অভিভাবকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের কোমলমতি শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যায়, কিন্তু তাদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। এই বিদ্যালয়টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বছরের পর বছর অবকাঠামোগত উন্নয়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। একটি আধুনিক ও টেকসই বিদ্যালয় ভবন এবং নিরাপদ সড়ক এখন সময়ের দাবি।
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছোমেসিং মারমা জানায়, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট পাহাড়ি পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। সে বলে, “আমরা আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করি। কিন্তু বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়ে। অনেক সময় ভিজে ভিজেই ক্লাস করতে হয়। নতুন ভবন হলে আমরা আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারব।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মংক্যচিং মারমা বলেন,“বর্তমান বিদ্যালয় ভবন শিক্ষার্থীদের চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত। নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি নতুন ভবন নির্মাণ জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যালয়গামী সড়ক উন্নয়ন করা হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণের যাতায়াত অনেক সহজ ও নিরাপদ হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা পুহ্লামং মারমা (৪২) বলেন, “সড়ক উন্নয়ন না হওয়ায় শিক্ষকরা অনেক সময় যাতায়াতে সমস্যার সম্মুখীন হন। নতুন ভবন নির্মাণ এবং রাস্তা উন্নয়ন হলে এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এ বিষয়ে রুমা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আশিষ চিরান জানান, “বিদ্যালয়ের জন্য পাহাড়ি এলাকার উপযোগী বিশেষ নকশার একটি ভবন নির্মাণের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আগামী-২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে আমরা আশাবাদী।
পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা বলেন, “এলিম সাংদালা পাড়া একটি শান্ত ও মনোরম পাহাড়ি এলাকা। বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের স্বার্থে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ ও সড়ক উন্নয়ন প্রয়োজন।
স্থানীয় অভিভাবক,শিক্ষার্থী এবং সচেতন মহলের অভিযোগ,দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা এখনো ন্যূনতম শিক্ষা অবকাঠামো থেকে বঞ্চিত। যেখানে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হচ্ছে, সেখানে এলিম সাংদালা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে শিক্ষা গ্রহণ করছে।
তাদের দাবি,সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর,পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিদ্যালয়ের জন্য আধুনিক ভবন নির্মাণ ও বিদ্যালয়গামী সড়কের উন্নয়ন নিশ্চিত করুক। অন্যথায় পাহাড়ি অঞ্চলের শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এলাকাবাসীর একটাই প্রশ্ন—নিয়মিত পাঠদান চলছে, শিক্ষার্থীরা স্কুলমুখী,অথচ একটি নিরাপদ ভবন ও চলাচলের উপযোগী সড়ক পেতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে?
রেদামং মারমা (৭২), কারবারি, বলেন:
“আমাদের পাড়ায় ২৬টি পরিবার বসবাস করে। এই এলাকায় একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত, কারণ এর মাধ্যমে আমাদের সন্তানরা নিজ পাড়াতেই শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত উপস্থিত থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করছেন, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবে বিদ্যালয় ভবনটি জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা হওয়ায় শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের দুর্ভোগের মধ্যে পড়ছে। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় ভবনটি দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।”