বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার ১নং পাইন্দু ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের চান্দা হেডম্যান পাড়ার মেধাবী শিক্ষার্থী উখ্যাইংওয়ং মারমা দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের মার্কেটিং সাবজেক্ট (বিবিএ) বিভাগ থেকে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েও আজ অর্থাভাবে চূড়ান্ত ভর্তি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
একদিকে দারিদ্র্য,অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন—এই দুইয়ের নির্মম লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক পাহাড়ি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও আর্থিক সংকটের কারণে তার স্বপ্ন এখন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
আজ-১৭ জুন সকালে জানা গেছে,উখ্যাইংওয়ং মারমার পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। পরিবারের পক্ষে তার পড়াশোনার ব্যয় বহন করা সম্ভব না হওয়ায় ২০১৬ সালে তাকে চট্টগ্রামের একটি সরকারি এতিমখানা তথা সরকারি শিশু পরিবারে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে সরকারের সহায়তায় থাকা-খাওয়া, বই-খাতা, পোশাকসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে তার শিক্ষাজীবন এগিয়ে যায়।
দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ২০২৩ সালে ফরহাদাবাদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৬১ অর্জন করেন। পরবর্তীতে হাটহাজারী সরকারি কলেজ থেকে-২০২৫ সালে এইচএসসি পরিক্ষায় জিপিএ-৪.২৫ পেয়ে সম্পন্ন করেন।
উখ্যাইওয়ং মারমা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন তার মনে জন্ম নেয় যখন সরকারি শিশু পরিবারে থাকা বড় ভাইদের মধ্যে একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পরের বছর আরেকজন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। তাদের সাফল্যের গল্প এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা শুনে তিনিও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন—একদিন তিনিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হবেন।
কিন্তু স্বপ্নের সেই পথে ছিল অসংখ্য বাধা। ভর্তি প্রস্তুতির জন্য অর্থের প্রয়োজন হলে তার মা নিজের কানের স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে ছেলেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কোচিংয়ের জন্য পাঠান। সেখানে বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিল (বিএমএসসি) চবি শাখার “পেইং আমুঙ” ৬ষ্ঠ ব্যাচে ভর্তি হয়ে প্রায় ৫-৬ মাস কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন।
অবশেষে তার সেই ত্যাগ ও সংগ্রামের ফল আসে।
তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ বিভাগের মার্কেটিং সাবজেক্ট অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পরও চূড়ান্ত ভর্তি ফি, যাতায়াত ও প্রাথমিক শিক্ষাব্যয় বহনের সামর্থ্য না থাকায় তার ভর্তি এখনো অনিশ্চিত হয়ে আছে।
আমার ছেলে স্বপ্ন আর মেধার জোরে আজ যে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে,তা দেখে আমি একজন বাবা হিসেবে খুবই আনন্দিত ও গর্বিত। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও বুকের ভেতর এক গভীর কষ্ট কাজ করছে। কারণ,তার উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ভর্তি ফি দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। আমরা দিন আনি, দিন খাই—সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। তাই ছেলের পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করব,সেই চিন্তায় দিন-রাত অস্থির হয়ে আছি।
রুমা উপজেলায় স্থানীয় সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন,রাষ্ট্র যখন শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে,তখন কি শুধুমাত্র অর্থের অভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যাবে? পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন সংগ্রামী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কি দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হবে?
পাড়াবাসী বলেন ছেলেটির অসাধারণ মেধা ও শিক্ষার প্রতি আন্তরিক আগ্রহ দেখে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তবে আমাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত; ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত সহযোগিতা করতে পারি,যা তার উচ্চশিক্ষার ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাই সরকারের পক্ষ থেকে যদি তার জন্য কোনো আর্থিক সহায়তা বা বিশেষ সুযোগের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে সে অনেক উপকৃত হবে। একজন দরিদ্র কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে সমাজ ও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।”
উখ্যাইওয়ং মারমা বাবা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি,জনপ্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, যেন দ্রুত এগিয়ে এসে উখ্যাইংওয়ং মারমার পাশে দাঁড়ানো হয়। সামান্য আর্থিক সহায়তাই বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের ভাগ্য এবং গড়ে তুলতে পারে একজন শিক্ষিত, দক্ষ ও মানবসম্পদ।