চট্টগ্রাম শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরুত্বে অবস্থিত হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) এর মাজার শরীফ। আনোয়ারা উপজেলার দেয়াঙ পাহাড় ঘেরা বটতলী ইউনিয়নের রুস্তমহাট এলাকায় হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) মাজার অবস্থিত। আল্লাহ্ তায়ালার মনোনীত দ্বীন ইসলামের প্রচার প্রসারে আল্লাহ্ পাক তার প্রিয় রাসুল (সা.)’র নির্দেশে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ইসলামের বিজয়কেতন উড়িয়েছেন এবং এদেশে মজলুম মানবগোষ্ঠীকে ইসলামের শান্তির ছায়াতলে স্থান দিয়েছেন।
হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) সুদূর প্রাচীন আরব (ইয়েমেন) থেকে সমুদ্রপথে চট্টগ্রামে আগমন করেছিলেন। তাঁর মামা হজরত বদর আউলিয়া (রহ.)-এর সঙ্গী হয়ে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ বছর আগে তিনি বর্তমান চট্টগ্রামের আনোয়ারা অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক দীক্ষায় মুগ্ধ হয়ে অসংখ্য মানুষ তখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
মাজার পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা যায়, বাবাজান কেবলা হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) কখন এবং কিভাবে বাংলাদেশে আগমন করেন তার ইতিবৃত্ত জানা যায়নি। কিংবদন্তিতে প্রকাশ পায় শত বৎসর পূর্বে তার শ্রদ্ধেয় মামা হযরত বদর আউলিয়া (রহ.) সহ প্রথম দিল্লিতে পদার্পণ করেন।
বাবাজান কেবলা দীর্ঘদিন ধরে এবাদত রেয়াজতে মগ্ন ছিলেন এভাবে ইবাদত করতে করতে অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে ৯৮৫ হিজরী ৯৭১ বাংলা ৬ আষাঢ় ১৫৬৫ সনে তিনি আল্লাহ্ তায়ালার সান্নিধ্যে স্থায়ীভাবে জান্নাতবাসী হন। ইন্না....রাজেউন।
মাহাবুবে রব্বানী গাউছে ছমদানি হযরত শাহসূফি ছৈয়দ বাবা মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ৮৮৬ হিজরী ৭২ বাংলা ১৪৬৬ সনে ১২ রবিউল আউয়াল জন্ম গ্রহণ করেন।
সূত্রে জানা যায়, হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) আনোয়ারা উপজেলার দক্ষিণ গহিরা গ্রামের পশ্চিমে সমুদ্র উপকূল কড়ির হাট নামক স্থানে নামেন প্রথম। গহিরা উপকূল থেকে প্রায় ৮ মাইল পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের তীরে ছিল কড়ির হাট। সময়ের বিবর্তনে কড়ির হাটটি সাগরে বিলীন হয়ে যায়। সেই কড়ির হাটে মামা-ভাগিনা সাময়িকভাবে অবস্থান করেছিলেন। তাদের আস্তানাও গড়ে তোলেন সেখানে। প্রথম আগমনস্থল ওই জায়গাটির নাম ‘বার আউলিয়া আস্তানা’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে পরে। বার আউলিয়া আস্তানা হিসেবে খ্যাত স্থানটি একাধিকবার সাগরে তলিয়ে গেলেও এলাকার লোকজন নিকটবর্তী সমুদ্রের তীরে পুণ্যস্থান হিসেবে আবার ‘বার আউলিয়া আস্তানা’ নামক গৃহ পুননিমার্ণ করে আজও স্মৃতি ধরে রেখেছেন। কড়ির হাট থেকে হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ও হযরত শাহ্ বদর আউলিয়া (রহ.) কর্ণফুলীর উত্তর পাড়ে চলে আছেন। হযরত শাহ্ বদর আউলিয়া (রহ.) আজকের চট্টগ্রামের চেরাগী পাহাড় নামক স্থানে এলাকায় চাটি জ্বালিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। আউলিয়ারা জ্বীন-পরী উপদ্রুত এলাকায় চাটি জ্বালিয়ে অবস্থান নিয়েছিলো। হযরত শাহ্ বদর আউলিয়া (রহ.) নগরীতে স্থায়ীভাবে আস্তানা গড়লেও হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) পুণরায় আনোয়ারায় চলে যান।
জনশ্রুতি আছে, ৮২৫-৮৭০ হিজরির কোনো এক সময়ে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারের জন্য হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) বার আউলিয়ার পূর্ণভূমি চট্টগ্রামে আগমন করেন। পরে আনোয়ারা উপজেলার ঝিওরি গ্রামে অবস্থান নেন। তৎকালীন শঙ্খ নদীর উপকূলে হুজুরা শরীফ নামে একটি আধ্যাত্মিক সাধনালয় গড়ে তোলেন। এ হুজুরা শরীফকে কেন্দ্র করে এককালে শঙ্খের উপকূলে ঝিওরি গ্রামে গড়ে উঠেছিল শহর।
ডা. গোলাম সাকলায়েন তার লেখা ‘বাংলাদেশ সুফী সাধক’ গ্রন্থে লেখেন হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) কোনও পুত্রসন্তান নেই। বাংলাদেশে আগমনের পূর্বে তার একমাত্র কন্যা নুরজাহানের সাথে ভ্রাতুষ্পুত্র শাহ্ সেকান্দরের বিয়ে দিয়েছিলেন। পরে তাদেরকে ভারতে রেখে পানিপথে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। তার কন্যা নুরজাহান ও জামাতা সেকান্দর পরে মোহছেন আউলিয়ার খোঁজে চলে আসেন আনোয়ারার ঝিওরি গ্রামে। তারা তার সাথে সেখানে বসবাস শুরু করেন।
শ্রেষ্ঠ সাধক ও ধর্ম প্রচারক হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান ছিলেন বলে জানা যায়। ঝিওরি গ্রামে অবস্থানকালে তিনি অনেক অলৌকিক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
একটি কাহিনী- এমন-একদিন এক বোবা রাখাল ছেলে ওই হুজুরা শরীফের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখে তিনি ইশারা করে ডেকে তার কাছে নিয়ে যান। ওই সময় অনেক লোকজন উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছেলেটির মুখে হাত বুলিয়ে দিলে বোবা ছেলেটি মা মা করে চিৎকার দিয়ে চলে যায়। বোবা ছেলের মুখে কথা ফোটানোর ঘটনায় সকলে হতবাক। আরেক অলৌকিক ঘটনা- এক গোয়ালিনী হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) হুজুরা শরীফে দুধ দিতেন। হযরত ওই গোয়ালিনীকে আদর করে ঝি সম্বোধন করতেন। একদিন গোয়ালিনীর পরিবর্তে দুধ নিয়ে আসেন তার শিশুপুত্র। হুজুরা শরীফে দুধ নিয়ে আসতে মাটিতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে কলসির সমস্ত দুধ মাটিতে পড়ে যায়। ভয়ে ছেলেটি অঝোরে কান্না শুরু করে। ছেলেটির কান্না দেখে শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ঘটনাস্থলে যান। কলসিটি অক্ষত থাকলেও সব দুধ মাটিতে পড়ে যায়। তিনি ছেলেটির কান্না থামাতে চাইলেও কিছুতেই ছেলেটির কান্না থামে না। হযরত তৎক্ষণাৎ মাটি চিবিয়ে সমস্ত দুধ তুলে নিয়ে কলসিটি পূর্বের মতো দুধে ভরে দেন। অলৌকিক শক্তি দেখে তখন লোকজন হতভম্ব হয়ে যান।
মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) এমন অলৌকিক ক্ষমতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে দলে দলে বিভিন্ন ধর্ম-গোত্রের লোকেরা তার সংস্পর্শে এসে ইসলাম ধর্মের ছায়াতলে সমবেত হয়েছিলো।
ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের ‘পূর্ব পাকিস্তানে ইসলাম’ নামক গ্রন্থে হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) ওফাতকাল ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঝিওরি গ্রামের প্রথম তার দাফন করা হয় এবং সেখানেই মাজার গড়ে ওঠে। শঙ্খ নদীর ভাঙনে এক পর্যায়ে তার মাজারটি নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। একসময় নদী ভাঙনে লাশের কফিন দেখা যেতে থাকে। বড়উঠানের আন্নর আলী খাঁ নামের এক ব্যক্তি তখন স্বপ্নে দেখেন যে, শঙ্খ নদীর ভাঙনে হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) মাজার বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে। তিনি সেখানে থাকতে চান না। ওই ব্যক্তি সেই স্বপ্নের বিষয়ে গুরুত্ব না দিলে পরে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে একই স্বপ্ন দেখালে তিনি বটতলী গ্রামের লোকদের সহায়তায় ঝিউরি গ্রামে গেলে দেখতে পান- ঠিকই হযরতের লাশ মোবারক একটি পাথরের ওপর ভাসছে। তারপর তার লাশ বটতলী ররুস্তমহাটে সমাধিস্থ করা হয়। আবার এমন কথাও প্রচলিত আছে যে, তার কন্যা নুরজাহান ও জামাতা সেকান্দর শাহ এক স্বপ্নযোগে আদেশপ্রাপ্ত হন যে, তার ঝিওরিস্থ কবরের লাশ মোবারক উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা নাকি পাল্টা জবাব করে বলেছিলেন, লাশ কোথায় নিয়ে যাব? উত্তরে বলা হয়, ত্রিমুখাবিশিষ্ট রাস্তার পূর্ব পার্শ্বে উলুবনের বটগাছের তলে আমাকে পুণরায় দাফন করবে। তারা এ স্বপ্ন দেখার পর নির্ধারিত স্থান খুঁজতে থাকেন। একসময় তারা খোঁজাখুঁজি করে স্থান পেলেন। বর্তমান বটতলী মাজারের পার্শ্বে তৎকালীন লোকদের সহায়তায় শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) লাশ মোবারক ত্রিমুখা রাস্তাবিশিষ্ট উলুবনের বটগাছের নিচে দাফন করা হয়। সেই থেকে ওই জায়গাটির নাম হয় বটতলী গ্রাম। আনোয়ারা উপজেলার বটতলী ইউনিয়নে বটতলী গ্রাম অবস্থিত। এটা শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) দ্বিতীয় মাজার। সেখানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। তাঁর মেয়ে নুরজাহান ও জামাতা সেকান্দরকেও সেখানে কাছাকাছি সমাধিস্থ করা হয়।
উল্লেখ্য, বটতলীস্থ শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) মাজারে একখানি কালো পাথরের শিলালিপি সযত্নে রক্ষিত আছে। লিপিখানিটি আরবিতে লেখা।
মহান এই আধ্যাত্মিক অলি হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া রহ. বার্ষিক ওরশ আগামীকাল শনিবার (২০ জুন) চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলী এলাকার মাজার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে। এতে ৫ লক্ষাধিক ভক্ত ও ধর্মপ্রাণ মানুষ উপস্থিত হওয়ার আশা প্রকাশ করছেন মাজার পরিচালনা কমিটি।