চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতির কারণে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে জনদুর্ভোগ। নগরীর বহু বাসাবাড়িতে দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গ্যাসের চাপ এতটাই কমে যাচ্ছে যে রান্নার চুলা জ্বালানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে গ্যাসচালিত যানবাহনের সংকট তৈরি হওয়ায় নগরীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন ভিড়। কোথাও কোথাও ফিলিং স্টেশন ছাড়িয়ে এক থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের সারি পৌঁছে যাচ্ছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সিএনজি অটোরিকশা ও অন্যান্য গ্যাসচালিত যানবাহনের চালকেরা। অনেক যানবাহন দীর্ঘ সময় স্টেশনে আটকে থাকায় নগরের সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যাও কমে গেছে। এর সুযোগে বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও সহকারীদের বাগ্বিতণ্ডা থেকে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
★★ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
মঙ্গলবার নগরীর ষোলশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনের চিত্র ছিল গ্যাস সংকটের ভয়াবহতার প্রতিচ্ছবি। গ্যাস নেওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ গাড়ির দীর্ঘ সারি স্টেশনের সীমানা ছাড়িয়ে দুই নম্বর গেট পর্যন্ত চলে যায়। একেকটি গাড়িকে গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সিএনজি অটোরিকশাচালক নুরুল আমিন বলেন, সকাল ৯টার দিকে লাইনে দাঁড়ানোর পর বেলা ১১টা পর্যন্ত খুব সামান্যই সামনে এগোতে পেরেছেন। তার সামনে তখনও ৭০ থেকে ৮০টি গাড়ি অপেক্ষমাণ ছিল। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা শুধু গ্যাস সংগ্রহের পেছনেই চলে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষায়, দিনের বড় একটি অংশ যদি গ্যাসের লাইনে কেটে যায়, তাহলে যাত্রী পরিবহন করে আয় করার সময়ই বা থাকবে কতটুকু—এ নিয়ে চালকেরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
★★গ্যাসের অজুহাতে বাড়ছে পরিবহন ভাড়া
গ্যাস সংকটের প্রভাব এখন সরাসরি পড়েছে নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়। গাড়ির সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং চালকদের বাড়তি সময় ও খরচের যুক্তিতে বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করছেন যাত্রীরা।
হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. রুবেল জানান, অক্সিজেন থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত ৩ নম্বর বাসে স্বাভাবিক ভাড়া ৫ টাকা হলেও গত দুই-তিন দিন ধরে যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে মুরাদপুর থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত ৫ টাকার ভাড়াও দ্বিগুণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গ্যাসচালিত টেম্পোসহ অন্যান্য গণপরিবহনেও একই ধরনের বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। এতে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও হেলপারদের বাগ্বিতণ্ডার পাশাপাশি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
★★দিনে বন্ধ, রাতে সীমিত গ্যাস
চট্টগ্রাম মহানগর সিএনজি অটোরিকশা-অটোটেম্পো মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক টিটু চৌধুরী বলেন, নগরীতে গ্যাস সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। দিনের বেলায় অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। রাতেও সব স্টেশনে একসঙ্গে সরবরাহ থাকছে না।
তিনি বলেন, একটি গাড়িকে গ্যাসের জন্য সিরিয়ালে দাঁড়ানোর পর চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ কারণে বিপুলসংখ্যক সিএনজি অটোরিকশা রাস্তায় নামতে পারছে না। সংকটের সুযোগে কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। তবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
★★মাসজুড়ে একই চিত্র
নগরীর খুলশী এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনের মালিক মো. হাসান চৌধুরী জানান, গত প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহের এমন অনিয়ম চলছে। রাত ১২টা থেকে ১টার দিকে স্টেশনে গ্যাস আসছে এবং সকাল ৮টার দিকে আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে সিএনজি সরবরাহের জন্য ৫১টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। কিন্তু সব স্টেশনে একই সময়ে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না; পর্যায়ক্রমে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। ফলে একটি স্টেশনে গ্যাস থাকলেও অন্য স্টেশনগুলোতে সংকট দেখা দিচ্ছে।
কবে নাগাদ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হবে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
★★চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ৭৯ মিলিয়ন ঘনফুট
গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতির কথা জানিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)।
প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী মু. রইস উদ্দিন আহমেদ জানান, চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে সোমবার সরবরাহ করা হয়েছে ২৭১ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ একদিনেই চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল প্রায় ৭৯ মিলিয়ন ঘনফুট।
তিনি বলেন, সরবরাহের এই ঘাটতির প্রভাব শুধু আবাসিক গ্রাহকদের ওপর নয়; বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন খাতও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
★★জাতীয় গ্রিডে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি
অন্যদিকে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন জানান, সোমবার কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে।
তবে জাতীয় পর্যায়ে এলএনজি সরবরাহ থাকলেও চট্টগ্রামের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় নগরীতে সংকটের প্রভাব কাটছে না।
★★আবাসিক জীবন থেকে পরিবহন—সবখানেই চাপ
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে। দিনের বিভিন্ন সময়ে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক বাসায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। কেউ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছেন, আবার কেউ রান্নার সময় পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে চালকদের কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে। যানবাহনের সংখ্যা কম থাকায় যাত্রীদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোথাও বাড়তি ভাড়া, কোথাও অতিরিক্ত ভিড়—সব মিলিয়ে নগর পরিবহনে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহের এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে নগর অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
★★সংকট সমাধানের অপেক্ষায় নগরবাসী
চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী। বিপুলসংখ্যক মানুষের আবাসিক জীবন, পরিবহনব্যবস্থা, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য গ্যাস সরবরাহের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি তৈরি হলে তার প্রভাব একক কোনো খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতির বর্তমান পরিস্থিতিতে নগরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। তবে কবে নাগাদ চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট পুরোপুরি দূর হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থাই এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেনি।