পাহাড়ের বুক জুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। যতদূর চোখ যায়, হেক্টরের পর হেক্টর জুড়ে বাণিজ্যিক জুম চাষ। এই সবুজই পাহাড়ের প্রাণ। কিন্তু এই অপার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতা। যে মাটি সোনা ফলায়, সেই মাটির কারিগররাই থেকে যান বঞ্চিত।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় হলুদ, আদা, গোস্বা, সুগন্ধি বিনি চাল, কলা আর ঝাড়ু ফুলের বাম্পার ফলন হয়েছে। দেখে মনে হবে পাহাড়ে যেন সোনা ফলেছে। কিন্তু এই সোনা ফলানো মানুষগুলোর মুখেই হাসি নেই। কারণ একটাই - ন্যায্য দামের অভাব।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, শুধু এবছরই বাঘাইছড়ি উপজেলায় এক হাজারের মত হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে জুম চাষ হয়েছে। প্রতি বছর ঢাকা-চট্টগ্রামে টনকে টন হলুদ, আদা, বিনি চাল, কলা ও ঝাড়ু ফুল যাচ্ছে এই পাহাড় থেকেই। উৎপাদনে পাহাড় স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু সেই তুলনায় মূল্যায়ন হচ্ছে না উৎপাদকের।
সরেজমিনে কথা হয় কয়েকজন জুম চাষির সাথে। তাদের একজন, মধ্যম বয়সী জুম চাষি আক্ষেপ করে বলেন, আমরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাহাড়ে কাজ করি। এক মণ হলুদ ফলাতে অনেক খাটনি লাগে। কিন্তু বাজারে নিলে ন্যায্য দাম পাই না। অথচ শুনি চট্টগ্রাম-ঢাকায় এই হলুদ এখান থেকে চার গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়।
আরেকজন চাষি মিন্টু লাল চাকমা ক্ষোভ নিয়ে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে আমরা আর চাষ করবো না। আমাদের পরিশ্রমের যদি দাম না থাকে, মূল্যায়ন না থাকে, তাহলে এই জুম একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। তখন পাহাড়ও খালি হয়ে যাবে।
একই চিত্র পাহাড়ের কলা চাষেও। কলা বাগানের মালিক জীবন চাকমা বলেন, আমরা সারা বছর পাহাড়ে কলা বাগান পরিচর্যা করি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা আমাদের থেকে এসে প্রতি ছড়া কলা মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, সর্বোচ্চ ২০০ টাকায় কিনে নিয়ে যায়। দামাদামির কোনো সুযোগই দেয় না। অথচ খোঁজ নিয়ে দেখেছি, আমাদের সেই এক ছড়া কলাই ঢাকা-চট্টগ্রামে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি হয়।
চাষিদের অভিযোগ, স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। কৃষক বাধ্য হয়ে তাদের কাছেই কম দামে ফসল বিক্রি করে দেয়। কারণ পাহাড় থেকে ফসল সংগ্রহ করে ঢাকা-চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো,স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকরা কেউই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না। তবে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এর পেছনে রয়েছে একটি অদৃশ্য কালো শক্তি। সমতলের মানুষের মনে পাহাড় সম্পর্কে এখনো এক ধরনের ভয় কাজ করে। পাহাড়ে এলেই নানা ধরনের বাধা, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার অদৃশ্য ভয় তাদের তাড়া করে।
এই ভয়টাকেই পুঁজি করে লালন-পালন হচ্ছে একটি মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট। তারাই পাহাড় ও সমতলের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে একদিকে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তাকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে কৃষি অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা কৃষককে উৎপাদনে সব ধরনের সহযোগিতা করছি। ফলনও ভালো হচ্ছে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনাটা আমাদের হাতে নেই।
পাহাড়ের এই কালো ছায়া ভাঙতে ও এই সবুজ হাসি ধরে রাখতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি:
১. মসলা প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানির সাথে সরাসরি যোগাযোগ: পাহাড়ের উৎপাদিত জৈব হলুদ-আদা সরাসরি প্রাণ, এসিআই, স্কয়ারসহ দেশের বড় মসলা প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানির সাথে চাষীদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগী বাদ গেলে কৃষক ন্যায্য দাম পাবে।
২. হিমাগার নির্মাণ: পাহাড়ে কলা, আদার মতো পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি হিমাগার নির্মাণ করতে হবে। তাহলে কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবে না।
৩. সরকারি নার্সারি স্থাপন: উন্নত বীজ ও চারা সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাঘাইছড়িতে একটি সরকারি নার্সারি স্থাপন করা সময়ের দাবি।
বাঘাইছড়ি উপ-সহকারি উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ বলেন, পাহাড়ে জুমের ফলন অত্যন্ত ভালো। বিশেষ করে আমাদের দেশি হলুদ ও আদার মান অনেক উন্নত এবং সম্পূর্ণ জৈব। যদি সরকারি ভাবে সংগ্রহ ও পরিবহনের ব্যবস্থা করা যেত, অথবা কৃষক সমবায়ের মাধ্যমে সরাসরি ঢাকার সাথে সংযোগ করে দেওয়া যেত, তাহলে চাষিরা তাদের ন্যায্য দাম পেত। পাহাড়ের এই সোনা ফলা মাটিকে বাঁচাতে প্রশাসনকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। অন্যথায় জুম চাষিদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে, একদিন হেক্টরে হেক্টরে এই সবুজ আর থাকবে না।