সন্দ্বীপ থেকে সীতাকুণ্ড হয়ে চট্টগ্রামে নৌযাত্রার দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর ধরে নানা উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও সন্দ্বীপবাসীর নৌযাতায়াতের ভোগান্তি যেন কমছেই না। বরং জোয়ার-ভাটা, অচল পন্টুন, ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ সেতু ও ঘাট ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যায় প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে দ্বীপবাসীকে।
একসময় সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রাম যেতে হলে যাত্রীদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হতো যে, অনেকেই সন্দ্বীপের ঘাট থেকে লুঙ্গি পরে নৌযানে উঠতেন এবং সীতাকুণ্ড ঘাটে গিয়ে শুকনো কাপড় বা প্যান্ট পরে গন্তব্যে যেতেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দুর্ভোগের পুরোপুরি অবসান হয়নি।
সন্দ্বীপের বিভিন্ন নৌঘাট ও ফেরিঘাটের অবকাঠামো উন্নয়নে গত এক দশকে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ঘাট এলাকায় সেতু নির্মাণ, ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি সেতু নির্মাণ, প্রায় ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ফেরিঘাটের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জেলা পরিষদের প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে পন্টুনের সঙ্গে সংযোগ সেতু নির্মাণের পর ও একই কথা । কিন্তু এসব উন্নয়ন প্রকল্পের পরও সাধারণ মানুষের নৌযাত্রার দুর্ভোগ প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি।
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল গুপ্তছড়া ফেরিঘাটে দেখা গেছে হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য। একজন অসুস্থ রোগীকে স্ট্রেচারে করে ফেরিঘাটের পন্টুনের সংযোগ সেতু দিয়ে কোমরসমান পানির ওপর দিয়ে নামিয়ে নৌযানে তোলা হচ্ছে। রোগীকে এভাবে পানির মধ্যে দিয়ে পারাপার করতে গিয়ে স্বজন ও সংশ্লিষ্টদের চরম ঝুঁকি নিতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জোয়ারের সময় পন্টুন ও সংযোগস্থলে পানি উঠে যায়। অনেক সময় ঘাটে ওঠানামার জন্য নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা থাকে না। ফলে নারী, শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ রোগী ও মালামাল নিয়ে যাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
বিশেষ করে জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অ্যাম্বুলেন্স বা যানবাহন থেকে রোগী নামিয়ে নৌযানে তোলার সময় স্বজনদের পানিতে নামতে হয়। এতে রোগীর পাশাপাশি স্বজনদেরও দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকতে হয়।
সন্দ্বীপবাসীর প্রশ্ন—কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও যদি একজন রোগীকে কোমরপানির ওপর দিয়ে স্ট্রেচারে করে ঘাট পার হতে হয়, তাহলে এসব প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পেল?
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সন্দ্বীপের নৌযাতায়াতের দুর্ভোগ কোনো নতুন সমস্যা নয়; এটি দ্বীপবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। যুগের পর যুগ ধরে এ সমস্যা চলে আসছে। বিভিন্ন সময়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও ঘাটে যাত্রীবান্ধব ও নিরাপদ নৌযাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি।
তাদের দাবি, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; ঘাটের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জোয়ার-ভাটার উপযোগী পন্টুন, সংযোগ সেতু ও যাত্রী ওঠানামার নিরাপদ ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি রোগী, নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
সন্দ্বীপবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত গুপ্তছড়া ঘাটসহ দ্বীপের নৌঘাটগুলোর বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেবে।