আগামী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনের দিন-তারিখ এখনো ঘোষণা না হলেও নগরজুড়ে নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনা তুঙ্গে। বিশেষ করে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমের বাসায় এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর আগমন ঘিরে নগরবাসীর মধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।
আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম এবং সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম। এই তিনজনের মধ্যে বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-সমর্থিত সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে, সাদিক কায়েম জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তবে মোহাম্মদ মনজুর আলম কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচন করবেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
নগরবাসীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চসিক নির্বাচনে সাদিক কায়েম ডা. শাহাদাতের জন্য ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে কাজ করতে পারেন, অন্যদিকে মনজুর আলমের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা প্রতিকূল বলেই মনে করছেন অনেকে।
মোহাম্মদ মনজুর আলমের একটি শক্তিশালী নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। অতীতে তিনি চসিকের কাউন্সিলর ও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ভোট টানার সম্ভাবনাও তার ক্ষেত্রে আলোচনায় রয়েছে।
রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে আবু সাদিক কায়েমকে দেখা হচ্ছে ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা তাকে আলাদা করে তুলেছে।এতে তাঁর খুবই শক্ত অবস্থান।তবে তাঁর ও মনজুর আলমের ভোটের হিসাবনিকাশে ভাগফল এক।এতে করে সাদিক কায়েম প্রার্থী হলে মনজুর আলমের শনির দশা হতে পারেন।একইভাবে মনজুর আলম সাদিক কায়েমর ফলাফল কেড়ে নেওয়ার খল নায়ক হতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ডা. শাহাদাত হোসেনের একক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মোহাম্মদ মনজুর আলম মাঠে থাকেন, তবে ডা:শাহাদাতের বুকে কম্পন সৃষ্টি হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মনজুর আলমের ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক, জামায়াতের সাংগঠনিক সমর্থন এবং আওয়ামী লীগের (আইনগত নিষিদ্ধ) একটি অংশের ভোট নীরব বা কৌশলগত সমর্থন যুক্ত হয়, তাহলে তা নির্বাচনের সমীকরণকে জটিল করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চট্টগ্রামে ভোটের রাজনীতি বরাবরই বহুমাত্রিক। এখানে ব্যক্তি ইমেজ, দলীয় পরিচয় এবং স্থানীয় প্রভাব—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মনজুর আলম এই তিন ক্ষেত্রেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।এই মনজুর আলম সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারানোর ইতিহাস রয়েছে।
অপরদিকে বর্তমান মেয়র প্রার্থী শাহাদাত হোসেনের জন্য বিষয়টি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ, ভোটের একটি অংশ যদি বিভক্ত হয়ে যায়, তাহলে তা তাঁর সম্ভাব্য জয়কে কঠিন করে তুলতে পারে।
নগরবিদরা আরও বলেন, চসিক নির্বাচন শুধুমাত্র দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং এটি স্থানীয় শক্তির একটি পরীক্ষা। এখানে কে কাকে সমর্থন দিচ্ছেন, কোন এলাকায় কার প্রভাব বেশি—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, মনজুর আলমের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য জোট-সমীকরণ এবারের চসিক নির্বাচনকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরীর জলাবদ্ধতা ও মশার উপদ্রব আসন্ন নির্বাচনকে ডা:শাহাদাতের জন্য নেতিবাচক বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি মশার বিস্তার বেড়ে গেয়েছে।
নগর বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে জনদুর্ভোগ ও সেবা পরিস্থিতি বড় ভূমিকা রাখে। ভোটাররা সাধারণত রাস্তা-ঘাট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি—এই বিষয়গুলোর ভিত্তিতে তাদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করেন। তাই দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
তাদের মতে, যেহেতু চসিক নির্বাচন মূলত নাগরিক সেবা-কেন্দ্রিক একটি নির্বাচন, তাই ভোটারদের ক্ষোভ সরাসরি প্রার্থীদের ওপরও প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে যারা নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন বা ভবিষ্যতে দায়িত্ব নিতে চান, তাদের জন্য এসব ইস্যু রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ও তার সমর্থকরা দাবি করছেন, নগর সমস্যাগুলো বহু বছরের পুরোনো এবং এগুলো সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা আরও বলছেন, এককভাবে কোনো প্রার্থীর ওপর পুরো দায় চাপানো বাস্তবসম্মত নয়।
সব মিলিয়ে, জলাবদ্ধতা ও মশার উপদ্রবকে কেন্দ্র করে নগরবাসীর ক্ষোভ চসিক নির্বাচনের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ভোটের মাঠে এই ইস্যুগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোটারদের মনোভাবের ওপর।