শিরোনামঃ

শিক্ষকের আচার বিক্রির টাকায় স্বপ্ন বুনছে অসহায় শিক্ষার্থীরা

সাকিব মামুন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: দৈনিক দেশের কথা
ছবি: দৈনিক দেশের কথা

এক হাতে বোর্ডের মার্কার, অন্য হাতে আচার তৈরির উপকরণ। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আর অবসরে নিজের হাতে তৈরি করছেন নানা স্বাদের আচার। সেই আচার বিক্রির অর্থেই টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন একজন বিসিএস ক্যাডার শিক্ষক। বই-খাতা, থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে পড়াশোনার যাবতীয় খরচও বহন করছেন নিজের দায়িত্বে।

খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের বিসিএস ক্যাডার শিক্ষক ও ‘আচারি কাব্য’র প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ রাজন মিয়ার ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ এখন শুধু মানবিকতার গল্প নয়; হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ এবং উদ্যোক্তা হওয়ারও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি আম, চালতা, বড়ই, আমড়া, তেঁতুল, জলপাইসহ প্রায় ৩৭ ধরনের আচার তৈরি করেন রাজন মিয়া। তার তৈরি এসব আচার এখন দেশের ৬৪ জেলার বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। তবে এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ব্যবসা নয়—অসহায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সচল রাখা।

অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করেন তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিজের সঙ্গে রেখে থাকা-খাওয়া ও শিক্ষার যাবতীয় ব্যয় বহন করছেন। তার সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগও পেয়েছেন।

মানবিক এই শিক্ষক রাজন মিয়া বলেন, “টাকার অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক, এটা আমি চাই না। নিজের পছন্দের কাজকে কাজে লাগিয়ে যদি একজন শিক্ষার্থীর জীবন বদলাতে পারি, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না। ভবিষ্যতে আরও শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করার ইচ্ছা আছে।”

রাজন মিয়ার এই মানবিক উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রান্নার অভিজ্ঞতাও। প্রায় ২৭ বছর ধরে আচারসহ বিভিন্ন ধরনের রান্নায় পারদর্শী তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই রান্নার প্রতি ছিল তার বিশেষ আগ্রহ। নিজের পছন্দের সেই কাজই একসময় পরিণত হয়েছে আয় ও মানবিকতার মাধ্যম হিসেবে।

এই দক্ষতা তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তার মায়ের। ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছ থেকে রান্না ও বিভিন্ন ধরনের আচার তৈরির কৌশল শিখেছেন তিনি। মায়ের সেই শিক্ষা ও উৎসাহই আজ ‘আচারি কাব্য’র ভিত্তি বলে মনে করেন রাজন।

শিক্ষার্থীদের কাছে রাজন মিয়া শুধু শিক্ষক নন, একজন অভিভাবকও। তার সহায়তা পাওয়া শিক্ষার্থীরা বলছেন, স্যারের কাছ থেকে তারা শুধু পড়াশোনার সুযোগই পাননি, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষাও পেয়েছেন। বড় হয়ে তারাও রাজন স্যারের মতো মানবিক ও উদ্যোগী মানুষ হতে চান।

খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ সরাফত হোসেন বলেন, “রাজন মিয়ার উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। একজন বিসিএস ক্যাডার শিক্ষক নিজের দক্ষতা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে অসহায় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন—এটি সমাজের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।” তিনি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা ও খাতা মূল্যায়ন সহ প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন দায়িত্বে পালনেও বরাবরের মতোই দায়িত্বশীল।

স্থানীয় ফল ও প্রাকৃতিক উপাদানকে পণ্যে রূপ দিয়ে রাজন মিয়া দেখাচ্ছেন, মানবিক উদ্যোগের সঙ্গেও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তার ‘আচারি কাব্য’ এখন তাই শুধু আচার বিক্রির প্ল্যাটফর্ম নয়; টাকার অভাবে থমকে যাওয়া শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার এক মানবিক ঠিকানা।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL