শিরোনামঃ

আশেকে রাসুল হযরত হাফেজ আহমদ শাহ ছাহেব: চুনতির ১৯ দিনব্যাপী সীরাত মাহফিলের মহান প্রবর্তক

দেলোয়ার হোসেন রশিদী
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: দেলোয়ার হোসেন রশিদী
ছবি: দেলোয়ার হোসেন রশিদী

দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি—একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ। ধর্মীয় শিক্ষা, আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইসলামি সংস্কৃতির দীর্ঘ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই জনপদের নাম আজ দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে উচ্চারিত হয় একটি অনন্য আয়োজনের কারণে—ঐতিহাসিক ১৯ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল। আর এই বিশাল আয়োজনের সঙ্গে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে একজন মহান আধ্যাত্মিক সাধকের নাম—হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.), যিনি সর্বমহলে শাহ ছাহেব কেবলা চুনতি নামে পরিচিত।
নবীপ্রেম ও দ্বীনি চেতনায় নিবেদিত এই সাধককে অনুসারীরা ‘আশেকে রাসুল’ হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, আদর্শ ও সুন্নাহ মানুষের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয় থেকেই তাঁর হাতে সূচনা হয় চুনতির ঐতিহাসিক সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলের। ১৯৭২ সালে সূচনা হওয়া এই আয়োজন ধীরে ধীরে এক দিনের পরিধি পেরিয়ে কয়েক ধাপে বিস্তৃত হয়ে ১৯৮০ সাল থেকে ১৯ দিনব্যাপী রূপ লাভ করে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ১৯ দিনব্যাপী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
হযরত হাফেজ আহমদ শাহ (রহ.)-এর জন্ম ও শিক্ষাজীবন সম্পর্কে প্রকাশিত বিভিন্ন সূত্রে সামান্য তথ্যগত পার্থক্য রয়েছে। চুনতি-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক লেখাগুলোতে তাঁর জন্মসাল ১৯০৪ অথবা ১৯০৭ উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পিতার নাম মাওলানা সৈয়দ আহমদ (রহ.) এবং মাতার নাম হাজেরা খাতুন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বাঁশখালীর ছনুয়া মাদরাসা, চট্টগ্রামের চন্দনপুরা দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসা ও কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা করেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানুষের নৈতিক-আত্মিক উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁর চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত করা এবং মানুষকে ইসলামের আদর্শে জীবন পরিচালনায় উৎসাহিত করা। তাঁর জীবনাচরণ, ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনা তাঁকে চুনতি তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে একজন শ্রদ্ধেয় পীর ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
১৯৭২ সালে চুনতির সীরাত ময়দানে সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলের সূচনা করেন শাহ ছাহেব কেবলা। প্রথমদিকে আয়োজনটি ছিল স্বল্প পরিসরের। পরবর্তী সময়ে প্রতিবছর এর ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী ১৯৭৩ সালে দুই দিন, ১৯৭৪ সালে তিন দিন, ১৯৭৫ সালে পাঁচ দিন, ১৯৭৬ সালে ১০ দিন, ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালে ১২ দিন এবং ১৯৭৯ সালে ১৫ দিন আয়োজনের পর ১৯৮০ সাল থেকে এটি পূর্ণাঙ্গ ১৯ দিনব্যাপী মাহফিলে পরিণত হয়।
এই আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—বিভিন্ন মত ও ধারার আলেম, পীর-মাশায়েখ, ইসলামি চিন্তাবিদ ও বক্তাদের একই মঞ্চে এনে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা। ফলে সময়ের সঙ্গে চুনতির এই মাহফিল ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে একটি বৃহৎ মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ এ মাহফিলে অংশ নিতে চুনতিতে সমবেত হন।
শাহ ছাহেব কেবলার প্রবর্তিত মাহফিল কেবল একটি স্থানীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বছরের পর বছর দেশবরেণ্য আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদদের অংশগ্রহণ এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের কারণে এর পরিচিতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ে। চুনতি সীরাত ময়দানকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর হাজার হাজার, বিশেষ করে আখেরি মোনাজাতের সময় বিপুলসংখ্যক নবীপ্রেমিক মানুষের সমাগম ঘটে। মাহফিলের দীর্ঘ ঐতিহ্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আগত মুসল্লিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছাসেবক ও আয়োজকদের ব্যবস্থাপনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের খাবারের আয়োজন এ মাহফিলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে।
শাহ ছাহেব কেবলা তাঁর জীবদ্দশায় মাহফিলটিকে একটি ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে যেতে সক্ষম হন। চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদরাসার ইতিহাস-সংক্রান্ত তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে, তাঁর উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মাদরাসায় কামিল হাদিসের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা পুনরায় চালু হয়ে সরকারি অনুমোদন লাভ করে। অর্থাৎ তাঁর অবদান শুধু সীরাত মাহফিল প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; দ্বীনি শিক্ষা ও আলেম তৈরির পরিবেশ গড়ে তুলতেও তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন স্থানীয় ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৮৩ সালের ২৯ নভেম্বর শাহ ছাহেব কেবলা ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলের ধারাবাহিকতা থেমে যায়নি। বরং উত্তরসূরি, ভক্ত, অনুসারী ও আয়োজকদের উদ্যোগে প্রতিবছর আরও বিস্তৃত পরিসরে এ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তাঁকে চুনতির সীরাত ময়দানের বায়তুল্লাহ মসজিদের দক্ষিণ পাশে সমাহিত করা হয়েছে বলে স্থানীয় ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর ইন্তেকালের চার দশকেরও বেশি সময় পর আজও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় চুনতির সীরাত মাহফিলের সঙ্গে। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই মাহফিলের ৫৬তম আসর। একজন মানুষের জীবদ্দশায় শুরু করা একটি ধর্মীয় আয়োজন কীভাবে সময়ের পরিক্রমায় বৃহৎ সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিণত হতে পারে, চুনতির সীরাত মাহফিল তার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
হযরত হাফেজ আহমদ শাহ ছাহেব কেবলার প্রবর্তিত ঐতিহাসিক ১৯ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলের ৫৬তম আসর ২৫ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার চুনতি সীরাত ময়দানে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী এবারের মাহফিলের কার্যক্রম ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। ইতোমধ্যে মাহফিলকে ঘিরে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে সুশৃঙ্খল পরিবেশে মাহফিল সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
চুনতির শাহ ছাহেব কেবলার জীবন ও কর্মের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত তাঁর প্রতিষ্ঠিত সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল। ১৯৭২ সালে যে আয়োজনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর তা আজ লাখো মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একজন আধ্যাত্মিক পীর হিসেবে হযরত হাফেজ আহমদ শাহ (রহ.)-এর প্রতি তাঁর ভক্তদের শ্রদ্ধা যেমন গভীর, তেমনি তাঁর প্রবর্তিত সীরাত মাহফিলও দক্ষিণ চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তাঁর রেখে যাওয়া এই আয়োজন প্রতিবছর নতুন প্রজন্মকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, চরিত্র, আদর্শ ও মানবিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করে চলেছে। চুনতির মাটিতে আজও তাঁর স্মৃতি অম্লান। আর প্রতিবছর ১৯ দিনব্যাপী সীরাত মাহফিলে লাখো মানুষের সমাগম যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—একজন মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেওয়া নবীপ্রেম কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একটি বৃহৎ সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিণত হতে পারে।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL