শিরোনামঃ

গ্যাসের স্বল্পচাপে অচলাবস্থা: 
কর্ণফুলীর সিএনজি স্টেশনে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি

কর্ণফুলী প্রতিনিধি
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: দৈনিক দেশের কথা
ছবি: দৈনিক দেশের কথা

কর্ণফুলী উপজেলাসহ চট্টগ্রামজুড়ে তীব্র গ্যাসের স্বল্পচাপে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। অনিয়মিত সরবরাহ ও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কর্ণফুলীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।

চরফরিদ এলাকার ‘ফয়সিল ও জিলানী’ সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে ক্রসিং মোড় পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে গ্যাস সংগ্রহের অপেক্ষায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। এতে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পুরো এলাকার পরিবহন ব্যবস্থা কার্যত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ যাত্রীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বৃষ্টির মধ্যেও কর্ণফুলীর অধিকাংশ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ছিল উপচে পড়া ভিড়। গ্যাস সংগ্রহের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে চালকেরা স্টেশনগুলোতে ভিড় করেন। বাঁশখালী থেকে গ্যাস নিতে আসা সিএনজিচালক আবদুর রহিম বলেন, গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে অনেক চালক কয়েক ঘণ্টা, এমনকি রাতভর লাইনে অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাননি। এতে সময় ও জ্বালানি—উভয় দিক থেকেই আমাদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

রহমান অ্যান্ড কোং লিমিটেডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনিট-২ ‘ফয়সিল’ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ইনচার্জ মো. আবু তৈয়ব বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রাহকদের সেবা দিতে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন শুধু সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা স্টেশন বন্ধ থাকে। বাকি ২১ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে চাহিদার তুলনায় দ্রুত সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।”

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কর্ণফুলী উপজেলার সাতটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন—ফয়সিল, তৈয়ব শাহ, কর্ণফুলী, প্রাকৃতিক, জিলানী, কামাল ব্রাদার্স ও ফোর স্টার—সবগুলোতেই একই চিত্র বিরাজ করছে। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে প্রতিটি স্টেশনেই গ্যাস সংগ্রহের অপেক্ষায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চালকদের দুর্ভোগও চরম আকার ধারণ করেছে।

স্থানীয় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ মন্নান বলেন, গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় আমরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছি। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় সময়মতো যানবাহনে জ্বালানি নিতে পারছি না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করেও অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। 
এতে প্রতিদিনের আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং পরিবারের ভরণপোষণ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছি। আয় কমে যাওয়ায় নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কিস্তি দিতে না পারায় বিভিন্ন ধরনের চাপ ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

চালকদের অভিযোগ, আগে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই গ্যাস নেওয়া সম্ভব হলেও বর্তমানে একই কাজের জন্য তিন থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে পূর্ণ ট্যাংক ভরার আগেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে অর্ধেক ট্যাংক গ্যাস নিয়েই স্টেশন ত্যাগ করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময়ের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

কেজিডিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিস্ট্রিবিউশন) রফিক খান বলেন, গত ১০ দিন ধরেই সংকট চলছে। তবে ছুটির দিনে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য আরও খারাপ হওয়ায় পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। শনিবার রাত থেকে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের প্রায় সব এলাকাই সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

সরেজমিনে কর্ণফুলীর কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, স্টেশনের ভেতর থেকে শুরু করে মহাসড়কের একাংশজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। এতে স্থানীয় সড়কগুলোতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দিনের বেশির ভাগ সময়ই সড়কের একাংশ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের দখলে থাকায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

সিএনজিচালিত অটোরিকশা আনোয়ারার চালক মোহাম্মদ রুবেল জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হওয়ায় প্রতিদিন নির্ধারিত সংখ্যক ট্রিপ দিতে পারছি না। এতে তাদের দৈনিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত যানবাহন না পাওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়াও গুনতে হচ্ছে।

পরিবহন খাতের পাশাপাশি আবাসিক ও শিল্প খাতেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। অনেক এলাকায় রান্নার সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় মানুষ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে শিল্পকারখানাগুলোও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুট। একটি ভাসমান এলএনজি (LNG) টার্মিনাল বন্ধ থাকায় প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম যুক্ত হচ্ছে, যা চলমান সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এর ফলে আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি খাতে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সিএনজিচালকরা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে, পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL