শিরোনামঃ

ঘুষের রেট বেঁধে বন বিভাগে দুর্নীতির সাম্রাজ্য!

বান্দরবান বন বিভাগে পোস্টিং বাণিজ্য, টিপি, পারমিট ও কাঠ পরিবহনে কোটি টাকার ঘুষের অভিযোগ; ডিএফও ও সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ, অস্বীকার সাইফুলের

মামুনুর রশিদ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, পোস্টিং বাণিজ্য এবং ঘুষের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বান্দরবান বন বিভাগকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম পুরো ঘুষ বাণিজ্যের অর্থ সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে বন বিভাগের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব পেতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পদায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। এরপর থেকেই ডিএফও ও সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার সমন্বয়ে বন বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে ঘুষ ও অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

অভিযোগ অনুযায়ী, বনের গাছ কর্তন, টিপি (ট্রানজিট পাস) ইস্যু, কাঠ পরিবহন, জট পারমিট, স্টক যাচাই, এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্ধারিত হারে ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। যদিও এসব অনিয়ম বন্ধে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। বরং সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে এসব অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে।

সূত্রগুলোর দাবি, বান্দরবানের গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ ও স্টেশনে পদায়নের জন্য রেঞ্জ কর্মকর্তাদের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা, রেঞ্জ সহকারীদের ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা এবং ফরেস্ট গার্ডদের ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া প্রতিটি টিপি (চালান পাস) ইস্যুতেও নির্ধারিত রয়েছে ১৩ হাজার টাকা ঘুষ।

অভিযোগে বলা হয়, টিপি থেকে আদায়কৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট ভাগ বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টন করা হয়। প্রতি বৃহস্পতিবার সদর রেঞ্জের টিপি শাখায় এ অর্থ ভাগাভাগি করা হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। একইভাবে স্টক যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুট কাঠে এবং জট পারমিট ইস্যুতেও নির্ধারিত হারে অর্থ আদায় ও বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে।

বান্দরবান বন বিভাগের আওতায় সদর, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, বেতবুনিয়া, পাইন্দু ও অন্যান্য রেঞ্জে একই ধরনের অনিয়ম চলার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট রেঞ্জে পারমিট ইস্যুর পর কাঠবোঝাই প্রতিটি ট্রাক থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বৈধ টিপির আড়ালে অবৈধ কাঠ পাচারের ক্ষেত্রেও চেকপোস্টে ট্রাকপ্রতি অতিরিক্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া একটি প্রভাবশালী দালালচক্রের মাধ্যমে আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয় কোন ব্যবসায়ীর কাঠ বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে পাচার হবে। পরে সেই তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে পরিবহনের সময় কোনো বাধার মুখে না পড়তে হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, "আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।"

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অনিয়মের কারণে সৎ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তারা অভিযোগ করেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুললেই বদলি, হয়রানি কিংবা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, পরিবেশবাদী এবং স্থানীয় সচেতন মহল।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL