চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা নিউমার্কেট মোড়ে সন্ধ্যার পর মোবাইল বের করলেই যেন ঝুঁকি। শুধু নিউমার্কেট নয়, জিইসি মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে মোবাইল ছিনতাই এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রিকশা, অটোরিকশা কিংবা হেঁটে চলা পথচারী—কেউই নিরাপদ নন। ছিনতাইকারীরা প্রকাশ্যেই ছুরি বা লাঠির ভয় দেখিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে একটি সুসংগঠিত অপরাধচক্রের চিত্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীতে সক্রিয় একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র ছিনতাই হওয়া মোবাইল সংগ্রহ করে বিশেষ কারিগরদের মাধ্যমে সেগুলোর পরিচয় পরিবর্তন করছে। আধুনিক সফটওয়্যার, মাইক্রোস্কোপ ও বিশেষ ডিভাইস ব্যবহার করে মোবাইলের আইএমইআই নম্বর, কেসিং এবং প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার পরিবর্তন করে ফোনগুলোকে নতুন পরিচয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত মালিকের জন্য ফোন শনাক্ত বা উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের এক বিশেষ অভিযানে এমন একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে ২৪টি আইফোনসহ মোট ১৫৭টি চোরাই মোবাইল, একটি ল্যাপটপ এবং আইএমইআই পরিবর্তনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এই চক্রের সঙ্গে আরও সদস্য জড়িত থাকতে পারে এবং তাদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে নগরবাসীর অভিযোগ, ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মোবাইল ফিরে পাওয়া যায় না। নিয়মিত টহলের অভাব, অপর্যাপ্ত নজরদারি এবং সংঘবদ্ধ চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। এতে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। চোরাই মোবাইল কেনাবেচার অবৈধ বাজার, আইএমইআই পরিবর্তনকারী কারিগর এবং পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনতে না পারলে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাণিজ্যিক এলাকায় দৃশ্যমান পুলিশ টহল, কার্যকর সিসিটিভি নজরদারি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
এদিকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীকে ধরে গণপিটুনির ঘটনাও ঘটছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত ও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা নগরবাসীকেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশায় জানালার পাশে বসে মোবাইল ব্যবহার না করা, রাতে নির্জন পথ এড়িয়ে চলা এবং মোবাইলের আইএমইআই নম্বর সংরক্ষণ করে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় দ্রুত থানায় অভিযোগ এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে তদন্তে সহায়ক হবে।
চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়—সংগঠিত অপরাধচক্রের মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে সমন্বিত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে চোরাই মোবাইলের অবৈধ বাজার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে নগরীতে ছিনতাইয়ের প্রকোপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।