টানা অতি ভারী বর্ষণে আবারও মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা। এক রাতেই পৃথক চারটি পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে, যেখানে একই পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
সোমবার (৬ জুলাই) ভোর পর্যন্ত কক্সবাজার পৌরসভার ছাত্তারের ঘোনা এবং উখিয়ার জামতলী, কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। রাতভর ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), প্রশাসন এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন।
পৌর এলাকায় ঘুমন্ত পরিবারের ওপর পাহাড় ধস
সোমবার ভোর প্রায় ৪টার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ছাত্তারের ঘোনা এলাকায় পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে আলী আকবর (৪৫)-এর বসতঘরের ওপর। বিকট শব্দে ঘুম ভাঙলেও মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটি মাটিচাপা পড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করে আলী আকবরসহ পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর পরিবারের অপর দুই সদস্য বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো অংশ ধসে পড়ে। স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক চেষ্টায় আহতদের উদ্ধার করা সম্ভব হলেও একজনকে বাঁচানো যায়নি।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
রোহিঙ্গা শিবিরে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়
রোববার দিবাগত রাত ১টা থেকে ভোর ৩টার মধ্যে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসে প্রাণ হারান আটজন।
জামতলী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে রাত দেড়টার দিকে পাহাড়ধসে বসতঘর চাপা পড়ে নিহত হন কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস। আহত হয়েছেন পরিবারের আরও দুই সদস্য।
রাত ২টার দিকে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-৭) ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে নিহত হয় সাত বছরের শিশু মো. একরাম।
এরপর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১১) সি-১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন প্রাণ হারান। নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), হারুনুর রশিদ (৩) এবং মোহাম্মদ রিহান (৫)।
উদ্ধারকারীরা জানান, ভারী বৃষ্টি ও কাদার কারণে অভিযান পরিচালনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও রাতভর অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।
ঝুঁকিতে এখনও হাজারো রোহিঙ্গা
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, অতি ভারী বৃষ্টির কারণে আরও পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী হাজারো মানুষ এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
প্রশাসনের তথ্যমতে, বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এর মধ্যে অন্তত ৮০ হাজার মানুষ পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে এসব শিবির নির্মাণ করা হয়। বন উজাড়, পাহাড় কাটা এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের কারণে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে।
২৪ ঘণ্টায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি
কক্সবাজারে রোববার দুপুর থেকে টানা বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরও অন্তত দুই দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে পাহাড়ধস, আকস্মিক জলাবদ্ধতা এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সতর্ক প্রশাসন, উদ্বেগে স্থানীয়রা
জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় নজরদারি জোরদার করেছে। মাইকিং করে পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তবে অনেক পরিবার বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানেই রয়েছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষার শুরুতেই প্রাণহানির ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পাহাড় সংরক্ষণ, নিরাপদ আবাসন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি উচ্ছেদ, বনভূমি সংরক্ষণ এবং আগাম পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন হবে।