চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ (৪৫) হত্যার পুরো ঘটনা ধরা পড়েছে সিসিটিভি ক্যামেরায়। ফুটেজে দেখা গেছে, পূর্বপরিকল্পিতভাবে অন্তত ছয়জন সশস্ত্র ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করে এসে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায়। তবে ঘটনার দুই'দিন পেরিয়ে গেলেও থানায় কোনো মামলা হয়নি, গ্রেপ্তারও হয়নি কেউ।
শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে ওষুধ কিনতে সিএনজি অটোরিকশায় করে পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারের আশরাফিয়া ফার্মেসির সামনে আসেন মাসুদ। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, তার সিএনজির পিছু নিয়ে আরেকটি সিএনজিতে করে বাজারে আসে ছয়জন অস্ত্রধারী। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে তারা নেমে মাসুদকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে।
প্রথম দফার গুলিতে আহত হলেও প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন মাসুদ। কিন্তু হামলাকারীরা তাকে ধাওয়া করে। একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে কিলারদের দুজন কাছে গিয়ে মাথায় পরপর দুটি গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। মাথা, বুক ও পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ১০ থেকে ১২টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।পুরো ঘটনাটি ছিল অনেকটা সিনেমার দৃশ্যের মতো।
সিসিটিভি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামলাকারীদের হাতে বিদেশি পিস্তল ও শর্টগান ছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অভিযান শেষ করে তারা পূর্বনির্ধারিত রুট ধরে সিএনজিযোগে হাফেজ বজলুল রহমান সড়ক হয়ে কদলপুরের পাহাড়ি এলাকার দিকে পালিয়ে যায়।
নিহত মাসুদ রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আব্দুল খালেক চৌধুরীর ছেলে।
নিহতের বড় ভাই ও বেতাগী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পিয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বলেন, “গত ১৭ বছরে আমাদের পরিবার রাজনৈতিকভাবে নানা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছে। কিন্তু কখনো প্রাণনাশের ঘটনা ঘটেনি। প্রকাশ্য দিবালোকে বাজারের মধ্যে আমার ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কারা, কেন এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। সিসিটিভিতে যাদের দেখা গেছে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হলে রহস্য উদঘাটন সম্ভব হবে।”
এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে ‘দামা ইলিয়াস’, মোহাম্মদ ইউছুপ, মোহাম্মদ দিদার, মোহাম্মদ আবছার এবং মোহাম্মদ জাহেদের নাম উঠে এসেছে। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, তারা কেউ রাউজানের, কেউ চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ও মোহাম্মদ রায়হানের অনুসারী।
স্থানীয়দের ধারণা, বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাসুদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত তিন থেকে চারজনের পরিচয় ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা সবাই রাউজানের বাসিন্দা। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।এখনো থানায় মামলা হয়নি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রযুক্তির সহায়তায় পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কারা এবং কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
রোববার বিকেল সাড়ে ৫টায় বেতাগী চাম্পাতলী ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মাসুদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মামলাহীন এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।