শিরোনামঃ

হারবাং অভয়ারণ্যে পাহাড় কেটে বনভূমি দখলের মহোৎসব : চলছে গাছ নিধন ও পাহাড় কাটা

এম.মনছুর আলম বিশেষ প্রতিবেদক, কক্সবাজার
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: এম. মনছুর আলম
ছবি: এম. মনছুর আলম

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জের আওতাধীন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার উত্তর হারবাং এলাকায় হারবাং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পাহাড় কেটে বনভূমি দখল, গাছ নিধন, পাহাড় কাটা, সংরক্ষিত বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ ও জমি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নীরব ভূমিকা ও যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে এসব কর্মকাণ্ড চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন ধরণের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সরেজমিনে অভয়ারণ্যের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উত্তর হারবাং নলবনিয়া এলাকায় অভয়ারণ্যের ভেতরে একটি বাগানের বিপুল পরিমাণ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ঘটনাস্থলে কাটা গাছের গুঁড়ি, করাতের গুঁড়া ও কাঠের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, দিনের পাশাপাশি গভীর রাতেও সংঘবদ্ধ গাছ চোর চক্র সেখানে গাছ কেটে বিভিন্ন স্থানে তারা পাচার করছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দারা জানান, বন বিভাগের টহল দল নিয়মিত ওই এলাকায় যাতায়াত করলেও গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তদ্রুপ একই চিত্র দেখা গেছে, উত্তর হারবাংয়ের বৃন্দাবনখীল এলাকায়। সেখানে একটি মাদ্রাসার পেছনের পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পাহাড় কাটার কারণে ভারী বৃষ্টিপাতে ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে বিভিন্ন বন্য প্রাণীর আবাসস্থল।
এছাড়াও উত্তর হারবাংয়ের নাপিতের চিতা এলাকায় বেলাল নামের এক ব্যক্তির বাড়ির পাশেও অভয়ারণ্যের ভেতরে নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বন বিভাগের চোখের সামনেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলেও জবরদখলকারী বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন কোন প্রকার বাধা দিচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, উত্তর হারবাংয়ের বরগুনা এলাকায় গাছ কাটার ঘটনায় ইসমাইল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও মোহছেন সিকদারপাড়া এলাকার রিয়াজুল হকের নাম অভিযুক্তদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁর নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে হারবাং পশ্চিম বৃন্দাবনখীল এলাকায় অভয়ারণ্যের প্রায় দুই একর জমি ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আব্দুল খালেক ওই জমি বিক্রি করেছেন। পরে পেকুয়ার উজানটিয়া এলাকার গিয়াস উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি জমিটি কিনে সেখানে দখল কার্যক্রম শুরু করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হারবাং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেন এসব ঘটনার বিষয়ে অবগত রয়েছেন। এমনকি তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় অভয়ারণ্যের বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চকরিয়া উপজেলার সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আলো বলেন, হারবাং অভয়ারণ্য শুধু একটি বনাঞ্চল নয়, এটি অসংখ্য বন্য প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এখানকার জীববৈচিত্র্য চরম সংকটের মুখে পড়বে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো অঞ্চলের পরিবেশের ওপর পড়বে।

চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান মাহমুদের কাছ থেকে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী অভায়রণ্যে বৃক্ষ নিধনের কারণে জীববৈচিত্র্য ও বিভিন্ন বন্য প্রাণীর আবাসস্থল দিন দিন সংকোচিত হয়ে আসছে। বন বিভাগের চোখের সামনে তাদের অর্থপূর্ণ উদারতায় বৃক্ষরাজি ধ্বংস হওয়াটা অত্যান্ত দু:খজনক। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বন সংরক্ষক কোন ভাবেই এ ধরণের বন নিধনের দায় এড়াতে পারে না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হারবাং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। গাছ কাটার সাথে জড়িত কয়েকজনকে বন মামলা দেওয়া হয়েছে। এরপরও কেউ বনভূমি দখল, পাহাড় কর্তনের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বনভূমি বিক্রির অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছু লোককে কাজ করতে দেখা যায়। পরে তাদের কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) নুর জাহান বেগম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি এখনো অবগত নই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL